আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে – পর্ব ২
অনুপ্রেরণা: “আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে” – সালমা চৌধুরী
পুনর্লিখন: Bangla Golper Asor BD
আলো-অন্ধকারের ভেতর লুকিয়ে থাকা সেই চেনা গন্ধ— দেয়াল, বিছানা, বুকশেলফ—সবই যেন ধুলোমাখা স্মৃতি নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
বাড়ি ছাড়ার আগের মতোই প্রতিটা জিনিস সাজানো-গোছানো।
এ যেন সময় থেমে ছিল এই এক ঘরেই।
মালিহা খান তাদের বাড়ির সবকিছু উলটপালট হলেও ছেলের রুমটা স্পর্শ করতে দেননি কাউকে।
বছরের পর বছর তালা লাগিয়েই রেখেছেন।
যখন মনকেমন করত, নিঃশব্দে এসে ছেলের বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে কান্না করতেন— যেন কেউ টের না পায় সেই ব্যথা।
রুমে ঢুকেই আবির লাগেজ নামিয়ে ঘরের চারদিকে একবার তাকাল।
তারপর পরনের টি-শার্ট হাতে নিয়ে শাওয়ার নিতে ঢুকে গেল।
শাওয়ার শেষে বেরিয়ে এল এক কফি কালারের টি-শার্ট পরে।
টাওয়েল দিয়ে চুল মুছতে মুছতেই দেখে তানভির খাটের কিনারায় বসে আছে।
নিশ্চুপ, কিন্তু মুখে কৌতূহল জমা।
আবির জিজ্ঞেস করল—
“কি হলো? কিছু বলবি?”
তানভির হাসল—
“ভাইয়া, একটা কথা… ওই যে লাস্ট লাগেজটা ধরতে দিলে না— ওতে কি আছে? আমার তো সন্দেহ হচ্ছে!”
আবিরের চোখে হঠাৎ কড়াকড়ি ভাব নেমে এল।
চোয়াল শক্ত করে বলল—
“ওটা আমার পার্সোনাল জিনিস।”
তানভির আবার দুষ্টু হাসি দিল—
“ব্যাটা মনটা তো খুব দেখতে চাইছে! একবার দেখলি ক্ষতি কী?”
গম্ভীর গলায় আবির—
“যা কাউকে দেখানোর মতো নয়, সেটা কাউকে দেখানো হয় না।”
তানভির বুঝে গেল—এই বিষয়ে আর এগোনো যাবে না।
বিষয় পাল্টিয়ে জিজ্ঞেস করল—
“বিকালে বের হবি?”
আবির মাথা নেড়ে হ্যাঁ জানাল।
তানভির উঠে বের হয়ে গেল।
আবির মোবাইল হাতে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেল নিজের মতো।
মেঘের ঘরে… নতুন অনুভূতি
নিজের রুমে ঢুকেই মেঘ খুলল শপিং ব্যাগ।
হাতের পর হাত তিনটি ড্রেস— প্রতিটাই যেন তার পছন্দের রং ও ডিজাইন।
দুটি গাউন আর একটি দারুণ কাজের থ্রি-পিস।
তারপর ল্যাপটপ খুলতেই চোখ বড় হয়ে গেল—
প্রয়োজনীয় সব অ্যাপস, ব্রাউজার, নোট— আগেই সেট করা।
মনে হচ্ছিল, কেউ যেন তার মনের কথাই পড়েছে।
হঠাৎ নজর গেল রঙিন র্যাপিং পেপারের বক্সটিতে।
খুলতেই— তিনটি উপন্যাস।
উপরে ছোট একটি চিরকুট—
“এডমিশনের পরে পড়বি।”
তার সঙ্গে আরেকটি ছোট বক্স— রঙিন পাথরের সংগ্রহ।
শৈশবে যেগুলো সংগ্রহ করতে পাগল ছিল মেঘ।
সবশেষে সেই বাক্স—
iPhone 13 Pro Max।
মেঘ তো স্তব্ধ।
মনের কোনো গোপন কোণায় বহুদিন ধরে লুকিয়ে রাখা একটা ইচ্ছে ছিল আইফোনের।
কিন্তু সাহস করে কাউকে বলেনি।
এতদিনের অচেনা আশা, অজানা স্বপ্ন— আজ যেন হঠাৎ সত্যি হয়ে গিয়েছে।
মেঘের চোখে চিকচিক করছে অদ্ভুত ঝিলিক, আনন্দের শিহরণ।
তার মনে একটাই প্রশ্ন—
"আবির ভাইয়া জানল কীভাবে?"
তানভিরের ছায়া-শাসন
মেঘ যখন ইন্টার দ্বিতীয় বর্ষে, তখন তানভিরই দিয়েছিল পুরোনো একটা ফোন।
নিজের সিমও দিয়েছিল, তবে কঠোর নিয়ম—
• অন্য কারও নাম্বার নয়
• কোনো স্যারকেও দেওয়া যাবে না
• একদম প্রয়োজন ছাড়া ফোন ব্যবহার নয়
মেঘ কখনো অভিযোগ করেনি।
অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল শাসনের সাথে হাঁটতে হাঁটতে।
তাই নতুন ফোন চাওয়া? সাহসই হয়নি।
একদিন পরীক্ষা চলাকালীন তানভিরকে সাহস করে বলেছিল—
“ভাইয়া… পরীক্ষা শেষ হলে একটা নতুন ফোন কিনে দিবা?”
তানভির এমন চোখে তাকিয়েছিল যেন সে বড় কোনো অপরাধ করেছে।
তখন থেকেই নতুন ফোনের আশা ছেড়ে দিয়েছিল মেঘ।
কিন্তু আজ…
যে কথা সে বলেনি কখনো…
যে ইচ্ছে কেউ জানত না…
সেই ইচ্ছে যেন পূরণ করে দিয়েছে কে? আবির?
চোখের ভেতর হালকা কেঁপে ওঠা আলোটা সে লুকাতে পারল না।
বিকেলের অঘটন
এদিকে আবির রুমে বসে ফোনে কাজ করছিল প্রায় এক ঘণ্টা।
ঠিক তখন আদি দৌড়ে এল—
“ভাইয়া খেতে ডাকছে!”
আবির বলল—
“আসছি।”
১০ মিনিটের মধ্যে সাদা শার্ট পরে নিচে নামল।
তখন বিকেল ৪টা।
নিচে খুব বেশি মানুষ নেই— সবাই আগেই খেয়ে ফেলেছে।
মালিহা খান অপেক্ষায় ছিলেন ছেলের জন্য।
ছেলের রেডি হয়ে বেরোবার চেহারা দেখে জিজ্ঞেস করলেন—
“কোথাও যাবি নাকি?”
“হ্যাঁ আম্মু, একটু কাজ আছে।”
খাবার টেবিলে আবির চুপচাপ খেতে লাগল।
তার ছোটবেলার প্রিয় সব রান্না— কিন্তু কিছুই বেশি খেতে পারল না।
ঠিক তখন তানভির এসে হাজির—
“চল ভাইয়া, রেডি আমি।”
দুই ভাই বেরিয়ে গেল।
সন্ধ্যার ঘরে ঘরে… আর মেঘের অপেক্ষা
যৌথ পরিবারের সন্ধ্যাবেলা মানেই হাসি-ঠাট্টার ভিড়।
মেঘ, মীম আর আদি খেলতে খেলতেই ব্যস্ত।
মেঘ তখনো আবিরকে দেখেনি।
কোচিং থেকে ফিরে রুমে ঢুকে এত গিফট নিয়ে ব্যস্ত ছিল।
অন্যদিকে আবির বেরিয়েছিল প্রায় দু’ঘণ্টা আগে।
বড় আব্বুর জেরা
ঠিক তখন আলী আহমদ খান ঘরে ঢুকলেন।
ঘরে ঢুকেই প্রথম প্রশ্ন—
“আবির কোথায়?”
মালিহা খান বললেন—
“তানভিরকে নিয়ে বের হয়েছে।”
তারপর তিনি মেঘকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন—
“পড়াশোনা কেমন চলছে?”
মেঘ ধীরে বলল—
“ভালো… তবে ফিজিক্স আর ম্যাথে একটু সমস্যা হচ্ছে।”
বড় আব্বু চিন্তা না করতে বললেন, টিউটর ঠিক করে দেবেন।
সাথে তানভিরকে নিয়ে ক্ষোভও ঝাড়লেন—
রাজনীতিতে আসক্ত হয়ে গেছে, পড়াশোনা শূন্য!
মেঘ মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
রাতে বাড়ি ফেরা… রহস্যের শুরু
রাত ৯টার দিকে আবির আর তানভির ফিরল।
টেবিলে তিন ভাই আর আদির খাওয়া চলছে।
ইকবাল খানের চোখে প্রথমেই ধরা পড়ল—
• আবিরের সাদা শার্টে রক্তের দাগ
• আর হাতে তিনটি ব্যান্ডেজ
“আবির, কি হয়েছে? হাত কেন বাঁধা?”
মালিহা খান ছুটে এলেন দুশ্চিন্তায়—
“কি হয়েছে বাবা?”
আবির শান্ত স্বরে—
“কিছু না। সামান্য কেটে গেছে।”
খাবার না খেয়ে রুমে উঠে গেল।
মেঘের অস্থিরতা
মেঘ রুম থেকে বের হতেই দেখল— আবির দরজা বন্ধ করল ঠিক তখনই।
এক ঝলক দেখাও হলো না তার।
এত গিফট দিয়েছে— ধন্যবাদটুকুও বলা হলো না।
তারপর টেবিলে বসে খাওয়ার সময় ইকবাল খান তানভিরকে জিজ্ঞেস করলেন—
“তুই তো ছিলি, কি হয়েছে?”
তানভির বলল—
“আমি মাঝপথে পার্টি অফিসে চলে গিয়েছিলাম। কিছুই জানি না।”
আলী আহমদ খান সন্দেহের গলায় বললেন—
“ওকে বলে দিও, এখানে কোনো মারামারি-রাজনীতি নয়। দেশে এনেছি দায়িত্বের জন্য।”
সবাই চুপ।
মেঘ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল সবার দিকে—
মন ভরে আছে অজানা প্রশ্নে।
তারপর আচমকা তানভিরকে জিজ্ঞেস করল—
“কি হয়েছে ভাইয়া? সত্যি বলো।”
তানভির তাকাল চোখ রাঙিয়ে—
“চুপচাপ খা।”
মেঘ মনে মনে বলল—
“আবির ভাইয়া মারামারি করলো? কেন? ও তো এত শান্ত ছিল…”
তার মনে ভয়, কৌতূহল আর এক অদ্ভুত টান…
সব মিলিয়ে এক ঝড় বয়ে যাচ্ছে ভেতরে।
চলবে...
“পরের পর্ব পড়ুন – আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে পর্ব ৩”
0 মন্তব্যসমূহ