Advertisement

Responsive Advertisement

আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে – পর্ব ৩ | নতুন রূপে ভালোবাসার গল্প

আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে – পর্ব ৩ | নতুন রূপে ভালোবাসার গল্প


 আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে – পর্ব ৩

অনুপ্রেরণা: “আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে” – সালমা চৌধুরী
পুনর্লিখন: Bangla Golper Asor BD


বারান্দার এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে আবির। তার চোখ স্থির হয়ে আছে দূরের পূর্ণ চাঁদের ওপর—
পলক যেন বহুক্ষণ পড়েনি। মনে হচ্ছে দৃষ্টি ছুঁড়ে গেছে এমন এক অস্থিরতায়, যার গভীরে এক অচেনা আতঙ্ক ঘুমিয়ে আছে।
মাথার ভেতরটা হঠাৎ কেমন চিনচিন করে ওঠে, যেন ভয় তার শ্বাসকেই আটকে দিয়েছে।

কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারে পাশে কেউ দাঁড়িয়েছে।
শরীরটা সোজা করে, চাঁদের দিকে তাকানো থামিয়ে পেছন ঘুরে দেখলো তানভিরকে।
নিম্নস্বরে জিজ্ঞেস করল—
“কিছু হয়েছে নাকি?”

তানভির ইতস্তত করে বলল—
“বড় আব্বু বুঝে গেছেন তুমি মারামারি করেছো। তাই আমাকে দিয়ে বলিয়েছেন যেন আর এসব ঝামেলায় না জড়াও। রাজনীতি বা মারপিট… কিছুতেই না।”

আবিরের কণ্ঠে উদাসীনতা—
“আর কিছু?”

—“না। ব্যবসার দিকে একটু মন দিতে বলেছেন,”—তানভির জবাব দিল।

আবির মাথা নেড়ে বলল—
“আচ্ছা। আর কিছু বলবি?”

তানভির দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল—
“কিছু না ভাইয়া… শুধু—মাথা ঠান্ডা রাখো। আমি জানতাম না তুমি হঠাৎ দেশে চলে আসবে। জানলে হয়তো আগে থেকেই ব্যাপারটা সামলে রাখতাম।”

আবির তীক্ষ্ণ হাসি দিল—
“মানে তুই বলছিস আমি বাদ দেই?”

—“না ভাইয়া! এভাবে কিছু বলতে চাইনি। যা হওয়ার তো হয়ে গেছে। এরপর আর যেন কিছু না হয়, তাই রেস্ট নিতে বলছিলাম।”

আবির শান্তস্বরে বলল—
“ঠিক আছে। আর একটা কথা—আমার ব্যাপারে এরপর থেকে যেন কেউ তোকে কিছু না বলে। আমি এখন বাসায় আছি। যার যা বলার, সরাসরি আমাকে বলবে। আর—আগামীকাল দুপুর ১২টার আগে যেন কেউ আমাকে না ডাকে।”

তানভির মাথা নেড়ে চলে গেল।

এরই মধ্যে চাঁদ মেঘে ঢেকে গেছে। আবিরের চোখ এখন অসীম দূরত্বে ভাসছে।
রুমে ঢুকে ব্যাগ থেকে একটা সিগারেট বের করল।
বারান্দায় বসে সেটাতে আগুন ধরাতেই দূরের ল্যাম্পপোস্টের আলো চোখে পড়ে।
আলোর নিচে দু-তিনটা কুকুর ডাকাডাকি করছে।

সিগারেট খাওয়ার অভ্যাস তার নেই—
কেবল তখনই সিগারেট ধরায়, যখন রাগ, দুঃখ, বদহজম চিন্তা আর নিয়ন্ত্রণ হারানো অনুভূতিগুলো তাকে গ্রাস করে।
কয়েক টান পরে সিগারেট নিভিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো—
হাত দুটো মাথার নিচে, চোখ বন্ধ।


মেঘ

এদিকে মেঘ দুপুরে ঘুমাচ্ছে না।
রাতে দেরিতে পড়ায় সকালে উঠতেই কষ্ট হয়।
HSC পরীক্ষা শেষ হয়েছে এক মাস হয়নি, অথচ পড়াশোনার চাপ যেন তিনগুণ বেড়ে গেছে।
কারণ সামনে ভর্তি যুদ্ধ—
যেখানে অস্ত্র কেবল পড়াশোনা আর ভাগ্য।

১৮ বছর বয়স ছুঁয়েছে মাত্র দুই মাস।
কয়েক মাস পর সে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পা দেবে—
এই ভাবনাই তাকে অদ্ভুতভাবে বড় মনে করায়।

রাতজাগা শেষ হলে ফোন হাতে নেয়।
নতুন ফোন, কিন্তু ব্যবহার করার মতো কোনো সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট নেই।
ইউটিউবে দু-চারটা ভিডিও দেখে ফোন রেখে দেয়।

হঠাৎ মনে পড়ে—
আবির ভাইকে ধন্যবাদ জানানো দরকার।
কিন্তু সে কি পারবেনা!
আবির মানেই তো ছোটবেলার সেই ভয়… সেই থাপ্পড়… সেই আতঙ্ক।

মনে পড়ে যায় সেই দিনটা—
মেঘ তখন পঞ্চম শ্রেণিতে, বয়স ৯-১০ বছরের মতো।
নতুন বন্ধু জয়—
একসাথে টিফিন ভাগাভাগি, খেলা, কথাবার্তা।

তারপর হঠাৎ এসে হাজির হয় আবির।
মেঘ ও জয়কে একসাথে খেলতে দেখে স্কুলের মাঝখানে এনে গালে কয়েকটা চড় মেরে বলে—
“আর কোনো ছেলের সাথে কথা বলবি না।”

দু’গালে লাল হয়ে থাকা পাঁচ আঙুলের দাগ মুছতে না মুছতেই মেঘ সপ্তাহজুড়ে জ্বরে পড়ে।
সেই থেকেই আবিরের সামনে দাঁড়ালেই মেয়েটার পা কাঁপে।
এমনকি সেই সময় থেকে সে আবিরকে দেখলেই রুমে লুকিয়ে যেত।

তারপর দুই বছর পর আবির বিদেশ গেল।
মেঘ খানিকটা স্বাধীন হলো। আবিরের পাশের রুমও দখলে চলে এলো।
বিদেশ থেকে সবাইকে ভিডিও কল করলেও মেঘের সাথে কথা হয়নি।
মেঘও কথা বলতে ভয় পেত।

এত বছর পর ভাই ফিরেছে, তবুও দেখা হয়নি এখনও।
আর আসার পরপরই… মারপিট।

আজকের ঘটনা শুনে মেঘের মাথায় ঘুরে বেড়ায় একটাই শব্দ—
হিটলার।
হিটলারের সঙ্গে আবিরের তুলনা করে নিজেই নিজের ওপর বিরক্ত হয়, তবু ভয়টা কমে না।

একটা ভাবনা মাথায় খোঁচা দিচ্ছে—
ধন্যবাদ জানানো উচিত। কিন্তু সে কি মুখ খুলতে পারবে?

এই ভাবনাতেই ঘুমিয়ে যায় মেঘ।


সকাল

ভোর থেকে বাসায় রান্নার ধুম।
তিন ভাই সকালেই অফিস বেরিয়ে যায়।
মেঘ ঘুম থেকে উঠে ৮টায়।
রাতজাগার কারণে সকালে দেরি তার নিয়ম হয়ে গেছে।

১০–২টা কোচিং।
তারপর টিউশন, বাড়ি ফেরা, খাওয়া, একটু ঘুম—
এভাবেই কাটে তার প্রতিদিন।

আজও ব্যতিক্রম হলো না।


আবির

দুপুর ১২টার একটু আগে রুম থেকে বেরিয়ে নিচে আসে আবির।
মুখ ভার, চোখে চিন্তার ছাপ।

মা মালিহা খান উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন—
“বাবা, কিছু হয়েছে?”

আবির নির্লিপ্তভাবে—
“না। খেতে দাও।”

খেতে খেতে মালিহা খান ছেলেকে বলছে এটা কোরো না, ওটা কোরো না—
মনে হচ্ছে যেন পাঁচ বছরের একটি শিশুকে বোঝাচ্ছেন।
কারণ মায়ের কাছে সন্তান সারাজীবনই তো শিশু।

হঠাৎ তার চোখ পড়ে আবিরের ব্যান্ডেজ করা হাতে, ফুলে থাকা আঙুলে।
মনটা কেঁপে ওঠে।

খাওয়া শেষে আবির বেরিয়ে যায়।


বাইক

এক ঘন্টা পর মেঘ কোচিং থেকে ফিরেছে।
খেয়ে নিচে বসেছে, এমন সময় তানভির দৌড়ে এসে বলল—
“বড় আম্মু, ভাইয়া কোথায়?”

মালিহা খান চমকে—
“অরে, অনেকক্ষণ আগেই বের হয়ে গেছে। কেন?”

তানভির কিছু না বলে ফোন বের করে কল দিলো—
তার চোখে উত্তেজনা। সবাই দরজার দিকে এগিয়ে যায়।
মেঘও আসে।

ঠিক তখনই নীল রঙের চকচকে একটি বাইক বাড়ির ভেতর প্রবেশ করে।
বাইক থেকে নেমে হেলমেট খুলতে খুলতে আবির চোখ রাখে সবাইয়ের দিকে।

মেঘ স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকে।
এ যেন সেই ছোটবেলার আবির নয়—
এ একদম নতুন মানুষ।

এলোমেলো চুল, সানগ্লাস, নেভি ব্লু শার্ট ইন করে পরেছে কালো প্যান্টের সাথে।
হাতে কালো ঘড়ি, পায়ে শো জুতা।

মেঘের হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি যেন চারগুণ বেড়ে যায়।
চোখ ফিরাতে পারে না।

আবির বলল—
“বাইকটা কিনেছি। কেমন হয়েছে?”

আবিরের কণ্ঠ শুনতেই মেঘের হুঁশ ফিরে আসে।
হঠাৎ দৌড়ে নিজের রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়।

ওদিকে মীম আর আদি উচ্ছ্বাসে চিৎকার করছে—
“ভাইয়া, আমাদের ঘুরাতে নিয়ে যাইও!”

মালিহা খান মন খারাপ করে বললেন—
“গাড়ি থাকতে বাইক কেনো?”

আবির সহজ স্বরে—
“আমার গাড়িতে ভালো লাগে না।”

কিন্তু পরিবারের তিন বউয়ের মুখ হঠাৎ অন্ধকার হয়ে যায়—
কারণ বাড়িতে বাইক চালানো নিষেধ করেছেন আলী আহমদ খান নিজেই।
কারণ তিনি জীবনে একবার গুরুতর এক্সিডেন্ট করেছিলেন।

তাই আলী আহমদ খানের ছেলেরা কেউ কখনো বাইক কেনেনি।
তানভিরেরও খুব শখ ছিল, কিন্তু বাবা মানা করেছেন।

আর আবির?
বাড়িতে ফিরেছে ২৪ ঘন্টার মধ্যেই বাইক কিনে ফেলেছে!


মেঘের হৃদয়ের ঝড়

মেঘ তার রুমে বসে আছে—
জানালার বাইরে তাকিয়ে।
হৃদয় কেমন জানি কাঁপছে।
অস্থিরতা যেন বাড়ছে প্রতিমুহূর্তে।

হঠাৎ নিজের মধ্যেই কেমন ঝলসে ওঠে মেয়েটা—
নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করে—

“বাই এনি চান্স…
আমি কি হিটলারটার উপর ক্রাশ খেয়েছি…???”


চলবে...

“পরের পর্ব পড়ুন – আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে পর্ব ৪”


মেঘ আর আরিবের গল্পটা কি আপনাকেও ছুঁয়ে গেল? ভালো লেগে থাকলে একটা ❤️ দিন, আর কমেন্টে লিখুন—“আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে” সিরিজের কোন মুহূর্তটা আপনার সবচেয়ে প্রিয়?

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ