আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে – পর্ব ৪
অনুপ্রেরণা: “আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে” – সালমা চৌধুরীপুনর্লিখন: Bangla Golper Asor BD
নিজের মাথায় হালকা থাপ্পড় মেরে ফিসফিস করতে লাগলো মেঘ—
“উফ্ মেঘ, তুই আবার কি সব ভাবছিস! কেউ কি নিজের চাচাতো ভাইয়ের উপর ক্রাশ খায় নাকি? ভালো, ভদ্র হলেও মানা যেতো, কিন্তু যে লোকটা রাগী, চুপচাপ, হিটলারের মতো স্বভাব, যার হাতে দশ বছরের মেয়েও মার খেয়েছে—তার উপর আবার ক্রাশ? ছিঃ!”
মেঘের বুকটা কষ্টে ভরে উঠলো।
নিজেকে সামলাতে সে ফোনটা হাতে তুললো আর কল দিল বন্যাকে। প্রথম রিং–এই কল ধরলো ও।
বন্যা: ওয়ালাইকুম আসসালাম, কি রে বেবি, কেমন আছিস?
মেঘ: ওয়ালাইকুম আসসালাম, ভালো… তুই?
বন্যা: আমিও ভালো। কিন্তু আমাকে হঠাৎ মনে পড়লো কেন?
মেঘ: তুই আজ কোচিং এ যাসনি কেন? কি যে একটা বিষয় মিস করলি!
বন্যা হাসতে হাসতে: বল তো দেখি, কি মিস করেছি?
মেঘ: বললে কি ফিল পাবি?
বন্যা: আরে বাবা বল প্লিজ! কাল তো ছুটি, দেখা হবে রবিবারে। ততদিন অপেক্ষা করা কঠিন।
মেঘ: আমার হাতে এখন iPhone 13 Pro Max।
বন্যা চুপ করে রইলো কয়েক সেকেন্ড। তারপর হো হো করে হাসলো—
বন্যা: হ্যাঁ ঠিক আছে, একটু পর ১৪ Pro Max–ও কিনে ফেলবি। যে মেয়ে আধাভাঙা ফোনে কষ্টে কষ্টে কল করে, তার হাতে নাকি iPhone! স্বপ্ন দেখে উঠেছিস বুঝি?
মেঘ অভিমানী গলায় বললো—
মেঘ: কাল আবির ভাই আসছেন বিদেশ থেকে। উনিই নিয়ে আসছেন আমার জন্য।
বন্যা আচমকা গলায় বিস্ময় মেশানো কৌতূহল—
বন্যা: ওহ্ তাই! না হলে তোর ভাই কি তোকে ফোন দিতো নাকি? আর বল তো, এই আবির ভাইটা কে যেন? যে তোকে ছোটবেলায় মেরেছিল?
মেঘ মুখ কালো করে বললো—
মেঘ: হ্যাঁ, আমার সেই চাচাতো ভাইই।
বন্যা: কিন্তু ওর এত মায়া হলো কেন হঠাৎ?
মেঘ: জানি না। তবে শুন, আজ বিকেলে উনাকে দেখে আমি একটু শক খেয়েছি।
বন্যা হাঁফ ছেড়ে বললো—
বন্যা: শক?
মেঘ: কি লুক, কি চেহারা, কি স্টাইল… দেখে আমার মাথা ঘুরে গেছে। মনে হয়… উনার উপর ক্রাশ খেয়ে ফেলেছি।
বন্যা মুহূর্তে গম্ভীর হয়ে গেল—
বন্যা: তোর মাথা ঠিক আছে? যাকে সারাজীবন দোষী বানিয়ে রেখেছিলি, আজ তাকে দেখেই ক্রাশ?
মেঘ চুপ।
বন্যা আবার বললো—
বন্যা: দেখ, এগুলো সাময়িক আবেগ। মাথা থেকে ঝেড়ে ফেল। আমরা তো ঠিক করেছিলাম—একজন বিপথে গেলে আরেকজন টেনে তুলে আনবো। ভুলে গেলি?
মেঘের মন ভেঙে গেল। দুর্বল গলায় জিজ্ঞেস করলো—
মেঘ: আমি কি দেখতে খুব খারাপ? আমি কি ক্রাশ হওয়ার মতো না?
বন্যা হাসতে হাসতে বললো—
বন্যা: তুই অবশ্যই সুন্দর। ক্রাশ খাওয়ার যোগ্যও। কিন্তু তুকে দেখে মনে হয় ছেলেরা না, বরং রাস্তা-ঘাট, গাছপালা, দেয়াল–ও তোর উপর ক্রাশ খেতে পারে!
রাগে গরম হয়ে ফোন কেটে দিলো মেঘ।
ওর এই জীবনটাই যেন তেজপাতা—হলেই শুধু ভাসে, তাতে কোনো স্বাদ নেই।
গার্লস স্কুল, গার্লস কলেজ, সবসময় ভাইয়ের পাহারা…
কোথায় কোনো ছেলে চোখে পড়বে?
বিয়েবাড়িতে গেলেও তানভির পাহারা দিত, বরযাত্রী আসলে ঘরে ঢুকিয়ে দিতো।
গায়ে হলুদ–নাচ গান সবই নিষেধ।
এত কিছুর মাঝে বন্যা, পাখি আর মায়া—এই তিন বান্ধবীকেও নজরে রাখতো তানভির।
মেঘের সাথে যেহেতু মেশে, তাই তাদেরও পাহারা।
মেঘের জীবনটাই একেবারে কালো–সাদা।
এইদিকে…
আবির বিকেল থেকে ঘুমাচ্ছিল।
সন্ধ্যা ৭ টায় আদির টানে ঘুম ভাঙলো তার।
বাবা আর চাচ্চু নিচে অপেক্ষা করছেন—
বাইক কেনার কথা শুনেই দুজন তেড়ে এসেছেন।
ঘুমে–বিহ্বল অবস্থায় আবির রুম থেকে বের হলো।
হাঁটতে হাঁটতে আচমকা মেঘের সাথে ধাক্কা লেগে যেতে যেতে থেমে গেল।
মেঘের এলোমেলো চুল, কালো ড্রেস, হতভম্ব চোখ…
সব একসঙ্গে যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য আবিরকে স্তব্ধ করে দিল।
তার চোখের পানির ফোঁটা চুল বেয়ে মেঘের সাদা টপে পড়ছিল।
মেঘ কাঁপতে থাকা গলায় বললো—
মেঘ: Thanks… Abir Vai…
আবির থামলো, কিন্তু পিছন ফিরে তাকালো না।
নিচে নেমে গেল।
মেঘ অনুভব করছিল—তার হাত-পা কাঁপছে, মাথা ঝিমঝিম করছে।
অজানা ভয়, উত্তেজনা, লজ্জা—সবই একসঙ্গে।
নিচে ততক্ষণে উত্তেজনা চরমে
আলী আহমদ খান গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করলেন—
“তুমি নাকি বাইক কিনেছো?”
আবির ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে—
“জি।”
“কিনেছো কেন?”
“ইচ্ছে ছিল।”
চাচ্চু বললেন—
“এই বাড়িতে বাইক নিষেধ, জানো না?”
আবির নির্লিপ্ত স্বরে—
“২০–৩০ বছর আগের ঘটনার ভয়ে আজও বাঁচবো? যদি কপালে খারাপ লেখা থাকে, তবে সেটা হেঁটে গেলেও হবে, গাড়িতে গেলেও হবে। বাইক নিয়ে বাড়াবাড়ির মানে দেখি না।”
বাড়ি জুড়ে পিনপতন নীরবতা।
মেঘ উপরে দাঁড়িয়ে সব শুনছে, আর ভাবছে—
“একেই আবার হিটলার বলেছিলাম আমি…”
এরপর নতুন বিস্ফোরণ
আবির বললো—
“আমি অনেকদিন ধরে নিজের একটা কোম্পানি শুরু করার কথা ভাবছি।”
সবাই চুপ।
চাচ্চুরা হতবাক—তারা ভেবেছিল আবির পারিবারিক ব্যবসা নেবে।
আব্বু শেষমেশ বললেন—
“ঠিক আছে। তুমি CEO হবে। শনিবারে অফিসে যাবে। পরে যদি চাও, নিজের কোম্পানি খুলবে—আমাদের আপত্তি নেই।”
আবির মাথা নেড়ে বললো—
“ঠিক আছে। কিন্তু আমারও একটা শর্ত আছে…
আমার দরকার হলে আমি নিজের মতো কাজ করবো, যেদিন রাত ২ টায় ফিরবো, সেদিনও যেন কেউ জেরা না করে। আর তানভিরকে ব্যবসায় টানার চেষ্টা করবেন না। ও রাজনীতিতেই থাকবে।”
এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে বেরিয়ে গেল আবির।
বাড়িতে আবার নীরবতা নেমে এলো।
রাত ১০টার পর
সবাই খাওয়া শেষ করে রুমে ফিরেছে।
আবির এখনও ফেরেনি।
মালিহা খান সোফায় বসে অপেক্ষা করছেন।
কিছুক্ষণ পর আবির আর তানভির ফিরলো।
ছেলেকে দেখে মালিহা খান অভিমানে বললেন—
“বউ আসলে আর অপেক্ষা করবো না।”
তানভির হেসে উঠলো।
আবির তাকাতেই হাসি চুপ করলো ওর।
মেঘ ওপর থেকে সব দেখছিল।
তার মনেও একরাশ কথার ঝড়—
“আমার জীবনে এক হিটলার কম ছিল, এখন আরেকজন এসে যোগ হলো! কপালটাই খারাপ।”
অবশেষে নিজের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করলো মেয়েটা।
চলবে...
“পরের পর্ব পড়ুন – আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে পর্ব ৫”মেঘ আর আরিবের গল্পটা কি আপনাকেও ছুঁয়ে গেল? ভালো লেগে থাকলে একটা ❤️ দিন, আর কমেন্টে লিখুন—“আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে” সিরিজের কোন মুহূর্তটা আপনার সবচেয়ে প্রিয়?

0 মন্তব্যসমূহ